“কিশোর গ্যাং” বর্তমান সমাজের এক আতঙ্কের নাম!

রিয়াজ উদ্দিন আকিব
সারা আনোয়ারা
০৪-০৮-২০১৯

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অপরাধ জগতে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম কিশোর গ্যাং। এরা শুরুতে মূলত পার্টি’ করা, হর্ন বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ভাইরাল করা এরকম ছোটখাট কাজে যুক্ত ছিল। বছর খানেক ধরে এরা এমন কোন অপরাধ নেই এরা করছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যা মামলায় জড়িত আসামি নয়ন বন্ডে সহ কিশোর গ্যাং এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

তাছাড়া গতবছর চট্টগ্রামের আলোচিত তাসফিয়া হত্যাও, আদনান নামের কিশোর গ্যাং এর সাথে জড়িত বলে অনেকেই ধারণা করছেন। যদি ও পুলিশি তদন্তে আত্মহত্যা বলে রিপোর্ট আসছে।

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যায় সাব্বির নামে এক কিশোর ও তার গ্যাং জড়িত বলে ধারণা করা হয়েছে।

ঢাকায় ২০১৭ সালে উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির বলি হয় এই কিশোর গ্যাং এর হাতে। তাকে মারার আগে তারা ফেসবুকে গ্রুপ ছবি পোস্ট করে যায়। ছবিতে তাদের সবাইকে নীল রঙের পোশাকে দেখা গেছে। কারও কারও হাতে ছিল হকিস্টিক। আদনানের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর এক কিশোর পাল্টা স্ট্যাটাস দিয়েছে, ‘ভাই তোর খুনিগো বাইর কইরা জবাই দিমু’।

গত ৬ এপ্রিল স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্বের জেরে নগরীর গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এমএইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে।দু’দিন পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সাইফুল।

সবশেষ ১৮ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় কিশোর অপরাধীদের নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে খুন হয়েছে এক কিশোর।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ বলছে, গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের ঘটনায় নগরীর ১৬টি থানায় অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে।

সামাজিক সংগঠক আবদুল মালেক চৌধুরী বলেন, হলিউড আর ভারতের ছবি গুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সহজে খুন করার স্টাইল, তাদের চলাফেরা আর অপরাধ করা দৃশ্য গুলো আমাদের সমাজের কিশোরদের অসম্ভব প্রভাব ফেলে। কিশোর বয়স মানে সহজেই প্রভাবিত হওয়া। ৪/৫ জন বন্ধু এক হলে তারা নিজেদের মনে করে তারা অনেক কিছু। তাছাড়া তাদের খেলাধুলা বা সংস্কৃতিতে ব্যস্ত রাখার মত অবকাঠামো বা পরিবেশ আমরা সমাজপতিরা তৈরী করে দিতে পারি নি।

টিআইবি চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী বলেন, এক শ্রেণির দুষ্ট ‘বড়ভাই’য়ের উৎসাহে স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোররা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে।

এসব কিশোর অপরাধী ‘গ্যাংয়ের’ ব্যাপারে তাদের অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবাই ছিলেন উদাসীন। সারাদেশে এই কিশোর গ্যাং ধ্বংস করে দিচ্ছে সাজানো গুছানো একটি পরিবার, সাথে ধ্বংস হচ্ছে সমাজ, রাষ্ট্র।

দিন দিন কিশোর অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ যেন বাড়ছেই। শুধু আইনের প্রয়োগ দিয়ে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে সরানো যাবে না। এ জন্য পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে।

সন্তানরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে অভিভাবকদের সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে, ধর্মীয় অনুশাসন মানতে হবে এবং সমাজের প্রত্যেক মানুষকে যে যার অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসলেই এর থেকে উত্তরণ সম্ভব।

Related posts