নাব্যতা হারিয়েছে আনোয়ারায় বয়ে যাওয়া খরস্রোতা শঙ্খনদী

মহিউদ্দিন মঞ্জুর
সারা আনোয়ারা

নাব্যতা হারিয়েছে শঙ্খ নদী
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৭টি উপজেলায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ নদ-নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে।

ফলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীর ১৫টি খরস্রােতা নদী তার শাখা-প্রশাখাসহ অস্তিত্ব সংকটে।

প্রতি বর্ষা মৌসুম শেষ হতেই পাহাড়ি ঢলে পলিমাটি এসে নদী ভরাট হয়ে যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পণ্যবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল নৌপথ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, পটিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা এ সকল উপজেলার মানুষ নদী পথে বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করত নৌপথে।

কালের বিবর্তনে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটায় এখন সে চিত্র আর চোখে পড়ে না। তারপরও নদীমাতৃক এদেশে চন্দনাইশের শঙ্খ নদীতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু না থাকায় অসংখ্য চর-ডুবোচর শঙ্খ নদীতে।

এ সকল নদীর পাশে কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক মিশ্রিত পানিগুলো কোথাও যেতে না পারায় হারিয়ে গেছে মিঠা পানির ১৫/১৬ প্রজাতির মাছ। নদীতে ড্রেজিং, পানি প্রবাহে বাঁধা, অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট নির্মাণ, যত্রতত্র মাটি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা করছে পরিবেশবাদীরা।

তাছাড়া জীববৈচিত্রেও নানা বিপর্যয়ের মুখে ধাবিত হচ্ছে। পানি সরবরাহ বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যাতায়াত ও পণ্য বহনের প্রধান নৌপথ আর নেই।

নদী পথে চলাচলের সময় নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল ব্যবসায়িক মোকাম, গোড়াপত্তন ঘটে শহরের। এদেশের প্রায় প্রতিটি বড় শহরই কোন না কোন নদীর তীরে অবস্থিত। বড় নদীর সাথে যেমন ছিল বহু বিচিত্র মনোহর নামের শাখা, উপনদীর সংযোগ, তেমনি ছিল অসংখ্য, খাল, হাউর-বাউর, বিল-ঝিল। খাল ও বিলের সাথে নদীর যোগ ছিল। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে এখনো নদীর সংখ্যা ৭শ’র অধিক। অতীতে আমাদের ছোট-বড় মিলে নদী ছিল আরো অনেক বেশি।

নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার। শঙ্খনদীর অব্যাহত ভাঙ্গন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নির্বিচারে পাহাড় কর্তনসহ বিভিন্ন কারণে মারাত্মক নাব্য সংকটে পড়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদী।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা থেকে শুরু হয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ নদীর বুকজুড়ে এখন অসংখ্য চর-ডুবোচর। ফলে ভয়াবহ দূষণসহ নানা ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বদলে গেছে নদীর প্রাকৃতিক রূপ। হারিয়ে যাচ্ছে শঙ্খ নদী কেন্দ্রিক নানা জৈববৈচিত্র্য। সংকটে পড়েছে নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য, বেকার হয়ে পড়েছে জেলেসহ কয়েক হাজার মানুষ। নাব্য সংকটের কারণে শঙ্খ নদী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ।

জানা যায়, বান্দরবান পার্বত্য জেলার গহীন অরণ্য পাহাড়ি উপজেলা থানছির মুরুং সম্প্রদায় অধ্যুষিত রেমাক্রি এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার ফুট উঁচু প্রবাহমান ঝর্ণাধারা থেকে এ শঙ্খ নদীর যাত্রা শুরু। উৎপত্তি স্থলে একটি ডিঙ্গি নৌকা চলাচলের সম-পরিমাণ পানির ধারা প্রবাহিত হলেও ধীরে ধীরে সর্র্পিল গতিতে উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড়ি বুক ছিড়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এ শঙ্খ নদী মিলিত হয়েছে চাঁনখালী নদীর সাথে।

প্রমত্তা এ শঙ্খ নদীর নাব্য হ্রাস পাওয়ায় নৌ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। নদীতে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর-ডুবোচর। নদীর মাঝে জেগে উঠা বিশাল আকৃতির চরে গ্রামের কিশোরেরা খেলায় মেতে উঠে প্রতিদিন। আবার অনেকে নদীর বুকে আবাদ করছে নানান জাতের সবজি। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সেচ বিপর্যয়সহ নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ সংকটাপন্ন। ইতোমধ্যে বালির আস্তরণে ঢাকা পড়েছে নদীর তীরবর্তী অনেক ফসলি জমি। বেকার হয়ে পড়েছে জেলে, নৌকার মাঝিসহ কয়েক হাজার মানুষ।

শঙ্খ নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা জানালেন, শঙ্খকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক হাট-বাজার, জনবসতি। শুধুমাত্র নদীকে ঘিরে চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী ছাড়াও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অনেক হাট-বাজার। এক সময় শঙ্খ নদী দিয়ে নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত বোটের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাট-বাজার ও বান্দরবানের ব্যবসায়ীদের মালামাল নৌ-পরিহনে যেত চট্টগ্রামে। সে সাথে বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা ও শঙ্খ নদীর তীরবর্তী এলাকার উৎপাদিত মৌসুমী শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন পণ্য নৌপথে যাতায়াত করত। যা সড়ক পথে বহন করতে খরচের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যেত। তাছাড়া শঙ্খ নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে অনেক জেলে পল্লী। যারা মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত।

শঙ্খ নদীর নাব্য সংকটের ফলে প্রতি বছর এ মৌসুমে জেলে ও বোট চালকেরা বেকার হয়ে পড়ে। তাদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। বিগত কয়েক যুগ ধরে রাক্ষুসী শঙ্খ নদীর করাল গ্রাসে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কয়েক হাজার পরিবার। এখন শঙ্খ নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। স্থানীয়দের মতে, শঙ্খ নদীতে এক সময় তিন হাজারের অধিক নৌকা ও ইঞ্জিন চালিত বোট চালিয়ে ৫ হাজার লোকের সংসার চলত।

এছাড়া নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত অনেক জেলে পরিবার। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় আগের মত মাছ ধরতে পারছে না জেলেরা। বেকার হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। নদীর পানির সাথে সম্পৃক্ত এসব পরিবার বর্তমানে খুব কষ্টে দিনযাপন করছে।

পটিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জানান, পাহাড়ি ঢল ও নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে ভরাট হয়ে গেছে শঙ্খ নদী। নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। কিন্তু নদী ড্রেজিং করার মত কোন প্রকল্প তাদের হাতে নাই। সে ধরণের কোন পরিকল্পনাও নাই। কারণ নদীর ড্রেজিং অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ জন্য সরকারেরও এ ধরনের কোন পরিকল্পনা নাই বলে তিনি জানান। সে হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন ড্রেজিং এর উদ্যোগ নেয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের শঙ্খ নদী তীরবর্তী অঞ্চলে শীতকালীন সবজি চাষ বিলম্বিত হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালের পরেও হেমন্তে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হওয়ায় বীজতলার চারা বিনষ্ট হওয়ায় চাষীরা সময়মত শাকসবজির চাষ শুরু করতে

Related posts