বিচিত্র অর্কিড (উদ্ভিদের ভিতর মানব শিশু)

শাহনাজ বেগম || আন্দিজ পর্বতের উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন একদল বিজ্ঞানী অভিযাত্রী। অবিরাম চলেছেন ক্লান্তিহীন দিনের পর দিন। খুঁজে চলেছেন উদ্ভিদের নতুন প্রজাতি। একদিন হঠাৎ করেই চোখ পড়ে গেল একটি বিশেষ ধরণের পাহাড়ি ফুলের দিকে। দেখে মনে হলো এনিমেটেড কোন কিছু। কিন্তু না, ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন সন্ধানীরা। দেখলেন প্রকৃতির বুকে অর্থাৎ গাছের বুকে কাপড়ে পেঁচানো অবিকল এক মানব শিশু যেন। জানতে পারলেন এগুলো আসলে অদ্ভূত সুন্দর মানব শিশু আকৃতির টেরেস্ট্রিয়াল অর্কিড ফুল। মানব শিশুর মত দেখতে অদ্ভূত আকৃতির এই অর্কিড ফুল পাওয়া যায় ভেনিজুয়েলা কলাম্বিয়া এবং ইকুয়েডরের আন্দিজ পাহাড়ে। এদের ন্যাচারাল হাবিট্যাট ১৪০০ থেকে ২৫০০ মিটার উচ্চতায় পাহাড়ে।

একদল উদ্ভিদ বিজ্ঞানী পেরু এবং চিলিতে দশ বছর ব্যাপী (১৭৭৭ থেকে ১৭৮৮) একটা অভিযানে(expedition) গিয়ে এই ফুলের সন্ধান পান। তারপরেও ১৭৯৮ সন পর্যন্ত ফুলটি মানুষের কাছে অজানাই থেকে যায়। ফুলটিকে নামকরণ করা হয় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম অনুসারে।।
এই ফুলটির ইংরেজি নাম দেয়া হয় সোয়াডল্ড বেবিজ অর্কিড (Swaddled Babies Orchid) যার অর্থ দাঁড়ায় কাপড়ে বা নরম কম্বলে জড়ানো নবজাতক শিশু। বিদেশে যেভাবে নবজাতক শিশুকে কাপড় দিয়ে জড়িয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়, ফুলগুলোকে সামনে থেকে দেখলে সেই রকম কাপড়ে পেঁচানো বা নরম কম্বলে জড়ানো নবজাতক শিশুই মনে হয়।

এই ফুলের আর একটি নাম টিউলিপ অর্কিড। ক্রিম-সাদা রঙের ফুলের পাপড়িগুলো মোম দ্বারা আবৃত থাকে। ফুলগুলো দারুচিনির মত মিষ্টি সুগন্ধিযুক্ত। বসন্তে যখন ফুল ফোটে তখন এই ফুলের তীব্র সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত।

এই গাছ ১৮ থেকে ২৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। এই ক্রিম-সাদা রঙের ফুল সাধারণত ফুটতে শুরু করে বসন্তে। সামারে এর তীব্র সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে অনেক দূরে। ফুলগুলো টিকে থাকে অনেকদিন। অল্প আলোতে ফুলগুলো ভালো থাকে। গাড় সবুজ রঙের গাছের পাতাগুলো পাতলা এবং ভাঁজ করা থাকে। ফুলগুলোকে ধারণ করে গোলগাল মোচাকৃতি বাল্বের আকৃতিসহ ডাঁটা।
এই গাছগুলো জংলা জায়গাতে থাকতে পছন্দ করে, যেখানে সুস্পস্ট ভেজা এবং শুকনো ঋতুর পার্থক্য থাকে। এই গাছের জন্য কিছুটা উষ্ণ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। ভালো এবং পুষ্ট ফুল তৈরি হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান হিউমিডিটি থাকার প্রয়োজন হয়। Orchidaceae পরিবারেরই সদস্য এরা। এই Anguloa জেনাস অর্কিডের প্রায় ১৩টি প্রজাতির তথ্য পাওয়া গেছে।

পটের মাটিতে এই অর্কিড লাগাতে হলে বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হয়। পরিষ্কার প্লাস্টিক, কাঠ অথবা নেটের পট যা মাটির মিক্সার দিয়ে ভরে দিতে হবে। গাছের নিচের দিকে মরা শিকড় থাকলে তা অবশ্যই কেটে ফেলতে হবে। হাল্কাভাবে অর্কিডের শিকড়কে বাছাই করা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং তারপরে খুবই আলতো ভাবে পানি দিয়ে পৌঁছে দিতে হবে শিকড় পর্যন্ত।
সামারে এই অর্কিডগুলো সপ্তাহে দুইবার খাবার পেতে পছন্দ করে এবং শীতকালে অন্তত একবার। গরমের মাসগুলোতে যদি ৫ থেকে ৭ দিন পানি দেয়া হয়… এদের গ্রোথ ভাল হয়। শীতকালে পানির পরিমান কমিয়ে দেয়া যায়।

এই ফুলের পরাগায়নের রহস্য প্রকৃতিই নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফুলের মুখের অংশের ঠোঁট দুটো এমনভাবে থাকে যে কোন পোকা সহজেই ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। যখন পরাগায়নকারী পোকা ফুলের মধ্যে ঢুকে যায় মধুর খোঁজে, তারা সব বাধা পেরিয়ে কলামের ভিতরে ঢুকে যায়। সেখানে পরাগরেণু ভর্তি একটি প্যাকেট থাকে যাকে বলা হয় পলিনিয়াম (pollinium)। পোকার মাথায় অথবা পেটে লেগে যায় ঐ পরাগরেণু। যখন ঐ পোকাটি একই প্রজাতির অন্য একটি ফুলে মধু সংগ্রহ করতে যায় তখন পোকার গায়ে লেগে থাকা পরাগরেণু ঐ দ্বিতীয় ফুলের স্টিগমাতে লেগে যায়। এভাবেই বিজ্ঞ প্রকৃতির বেঁধে দেয়া কিছু নিয়মের ফাঁদে পড়ে এই ফুলের পরাগায়ন ঘটিয়ে দেয় প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা পড়া কিছু পোকা। এভাবেই প্রকৃতি তাঁর সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে সবার অলক্ষে।

 

সারা আনোয়ারা
প্রকৃতি ও পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদন
২৭-০২-২০১৮

সূত্র: ইন্টারনেট

Related posts

Leave a Comment