ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ বেঁচে নেই

ডেস্ক রিপোর্ট – শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) রাত ৮টা ২৮ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। এর আগে ২৮ নভেম্বর শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন ফজলে হাসান আবেদ।

১৯৭২ সালে স্যার ফজলে হাসান আবেদের হাত ধরে যাত্রা শুরু বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাক।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ আর নেই।

স্যার ফজলে হাসান আবেদের জন্ম ১৯৩৬ সালে। লন্ডনে, হিসাব বিজ্ঞানে তিনি উচ্চতর বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৭২ সালে ফজলে হাসান আবেদের হাত ধরে যাত্রা শুরু বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও ব্র্যাক। কয়েক মাস আগে তিনি সংস্থাটির চেয়ারপারসনের পদ ছেড়ে অবসরে যান।

জীবনে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন ফজলে হাসান আবেদ। ১৯৮০ সালে ম্যাগসেসে পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া পেয়েছেন-বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার, স্পেনিশ অর্ডার অব সিভিল মেরিট, অফিসার ইন দ্য অর্ডার অফ অরেঞ্জ-নাসাউ, লিউ টলস্টয় ইন্টারন্যাশনাল গোল্ড মেডেল ইত্যাদি।

২০১৪ ও ২০১৭ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের নির্বাচিত ৫০ বিশ্বনেতার মধ্যে ফজলে হাসান আবেদের নাম স্থান পায়

নিভৃতচারী একজন মানুষ বিশ্বমানের একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এই অভাগা দেশে বসে। এশিয়ার না শুধু পৃথিবীর সবচে বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র‍্যাক।

নারী সহিংসতা রোধ, মাইক্রোফিন্যান্স, নারী উদ্যোক্তা তৈরি, আড়ং, ফিশারিজ, স্বাস্থ্য পরিষেবা সহ ৩০ টির অধিক নানান উদ্যোগ বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাসহ এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার ১২ টি দেশে এটির কার্যক্রম রয়েছে।

ব্র্যাক এর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ০১ (এক) লক্ষ এর মত কর্মী কাজ করে থাকেন। তবে এদের মধ্যে ৭০ ভাগই নারী কর্মী। ব্র্যাকের পরিষেবার আওতায় আছে ১২৬ মিলিয়ন লোক। একটি সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্ব-তহবিলযুক্ত দুগ্ধ, খাদ্য, কৃষি, গবাধি পশুর খামার ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে।

ব্র‍্যাক বাচ্চাদের জন্য এডুকেশন সিস্টেম বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে সেটা বাস্তবায়ন করেছে যেটা একটা আদর্শিক গর্ব ছিলো আমাদের গ্রাম গঞ্জে। সেটায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে দেশের সরকারও সরকারি প্রাথমিক স্কুলে বাস্তবায়ন করছে সেই সিস্টেমটা। জানামতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর কাছে শিখে সেটা সরকারি আওতায় আনা অভূতপূর্ব একটা ঘটনা। জাস্ট তহবিলের অভাবে একসাথে ৩০ হাজার প্রীস্কুল বন্ধ হয়ে গেছে টানা দুই দশশের বেশিদিন চলার পরে।

ব্র‍্যাক নামক প্রতিষ্ঠানের কথা মনে হলেই তাদের পরিচালিত প্রীস্কুলের চিত্রটাই প্রথম মাথায় আসে। প্রায় প্রতি গ্রামেই টিনের চালার ছোট্ট একটা ঘরে সকাল বেলা বাচ্চারা সুরে সুরে হৈ চৈ করে পড়া শিখছে তাও আবার আনন্দের সাথে! পাশ দিয়ে গেলেই মনটা আনন্দে ভরে উঠতো! কি সুন্দর করে স্যান্ডেল সাজানো! একেকদিন একেক ডিজাইন করে! কি পরিপাটি! সেই স্কুলে গেলে বাচ্চারা কি আনন্দে প্রত্যকে দর্শনার্থীদেরকে বিভিন্ন সৃজনশীল শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে গ্রহন করছে। পরিচিত হয়ে নিয়ে আবার পড়ায় মনোযোগী হচ্ছে। এরকম ৩০ হাজার প্রীস্কুল গ্রামে আনন্দপূর্ণ খেলাধুলার মাধ্যমে প্রীস্কুল সিস্টেম তৈরি করছিলো।

দুই দশকের বেশি এই প্রীস্কুলগুলো চলেছে। এই বাচ্চারা ব্র‍্যাকের প্রাইমারি স্কুল পার হয়ে জেনারেল স্কুল গুলোতে আনন্দপূর্ণ পড়ালেখার পরিবেশ না পাওয়ায় সেই সিস্টেম সে পর্যন্তই মুখ থুবড়ে পরে থাকলো। আনন্দপূর্ণ পাঠ আর শৈশব হারিয়ে আমরা ভ্যাচকানো একটা ভাঙ্গাচোরা জাতি পাচ্ছি। বাচ্চাদের পড়াশুনোয় ব্র‍্যাকের দেখানো এই পথটা যদি সরকার গ্রহন করে বাস্তবায়নের উপায় খুঁজতো তবে আমরা একটা সুরঙ্গের শেষে আলোর মুখ দেখতাম!

আমাদের এই অভাগা দেশে আলোর পথ দেখানো মানুষ জন্মে হাজার বছরে একজন। আমাদের সেরকম একজন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ মারা গেলেন আজকে।

এনজিওর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজনই যিনি তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান থেকে একটা পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। এই মরার দেশে এরকম দুর্নামের, দূর্নীতির অভিযোগ ছাড়াই চলে যাওয়া বিরল।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান স্মরণ করবে জাতি!
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশ গঠনের নিমিত্তেই ব্র‍্যাকের কার্যক্রম শুরু। আজীবন দেশকে দিয়ে গেছেন জীবন উজাড় করে।

উন্নয়ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমাধান সূত্র উদ্ভাবন করা ব্র‍্যাকের স্বপ্নদ্রষ্টা স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে আমাদের গভীর শোক।

Related posts