অপ্রচলিত ফল সুস্বাদু বৈচি বা লুকলুকি

শাহনাজ বেগম || অনেক দিনপর গ্রামের বাড়ি গিয়ে চোখে পড়ল বৈচি ফলের গাছ আর কচি কচি ফলগুলো, গাছটি আমার মায়ের হাতের লাগানো, মা নেই গাছটি ফলে ফলে টইটম্বুর।

বৈচি এক ধরনের টক মিষ্টি ফল।
অন্যান্য নাম – টিপফল, , লুকলুকি, পলাগোটা, পানিয়ালা, পানি আমলা, পাইন্না, পাইন্যাগুলা, বেহুই ইত্যাদি।অঞ্চলভেদে নামের ভিন্নতা থাকতে পারে।

এ গাছ নিচুভূমি এবং পাহাড়ি এলাকার বৃষ্টিবহুল অঞ্চলের ‘উইলো’ পরিবারভুক্ত বৃক্ষ।দক্ষিণপূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়াতে ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। অনেক অঞ্চলে এটি চাষ করার ক্ষেত্র ছেড়ে মুক্তভাবে জন্মে থাকে। এর আদি নিবাস জানা যায়নি তবে ধারনা করা হয়, এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চল বা ভারতবর্ষে উদ্ভূত।

রাস্তার পাশের ফল বিক্রেতাদের ঝাঁকায় আমলকী, অড়বড়ই সাথে থাকে আরেকটি ফল। গোলাকার মার্বেলের মতো দেখতে এই ফলটি বৈচি বা লুকলুকি। বাংলাদেশের অপ্রচলিত ফলগুলোর মধ্য একটি।

এটি ছোট গুল্মজাতীয় গাছ যা ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের কান্ড ও ডাল কাঁটাযুক্ত। পাতা গাঢ় সবুজ ও ডিম্বাকৃতির। পাতার অগ্রভাগ সূঁচালো এবং পাতার কিনারে খাঁজকাটা। গাছে মার্চ-এপ্রিল মাসে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল ফোটে। ফুলগুলো সাদাটে সবুজ বা বেগুনী রঙের এবং সুগন্ধ রয়েছে। ফল মার্বেলের মতো গোলাকার হয়। কাঁচা অবস্থায় ফলের রং থাকে সবুজ। ফল পাকে জুলাই-আগস্ট মাসে এবং ফল সংগ্রহ করা যায় নভেম্বর মাস পর্যন্ত। পাকা ফল লালচে বেগুনী রঙের হয়। পাকা ফলের ভেতরটা বাদামি বা কালচে গোলাপি। ফল খাবার বিশেষ নিয়ম রয়েছে। ফল টিপে নরম করে খেতে হয়। এ কারণেই ফলের এমন আরেক নাম টিপাফল।

বৈচি এমনিতেই খাওয়া যায়। এছাড়া ভর্তা বা সরবত তৈরি করেও খাওয়া যায়। বৈচি দিয়ে সুস্বাদু আচারও তৈরি করা যায়।

বৈচির রয়েছে নানাবিধ ঔষধি গুণ।
যেমন –
ফলের প্রায় ৬০ ভাগই রয়েছে আয়রন। এছাড়া এতে রয়েছে সালফার, ফসফেট ও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি।
গাছের শেকড় দাঁতব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হয়।
টিপা গাছের কচি পাতা ও ফল ডায়রিয়া রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পাকা ফল হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। এছাড়া লিভারের রোগেও ফল উপকারী।
টিপা ফল হৃদরোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। কারণ এতে রয়েছে রক্ত তরল করার উপাদানসমূহ।

বিভুতিভুষণ আর নজরুলের লেখায় এ ফলকে বৈচি বলা হয়েছে ।
কাঠের জন্যেও এই গাছ চাষ করা হয়।
ফলের ভিটামিন সি খাবারের প্রতি রুচি বাড়িয়ে মুখের ক্ষত সারাতে কার্যকর ।
এসিডিটির সমস্যা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

শহুরে জীবনে অপরিচিত হলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জনপ্রিয় ফল কাঁটাবহরী বা বঁইচি। ছোট গোলাকার ফলের মালা গেঁথে ছোট ছেলেমেয়েরা তা মজা করে খায়।

বর্তমানে বন উজাড় হওয়ায় গাছটি বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায়।
পাতা ও মূল অনেকে সাপের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করে। বাকলের অংশ তিলের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বাতের ব্যথা নিরাময়ে মালিশ তৈরি করা হয়।

বাংলার এক সময়ের অতিসুলভ আর বর্তমানের অতি দুর্লভ হয়ে ওঠা বৈঁচিফল। বৈঁচি গাছ দুই উপায়ে বংশবিস্তার করে। বীজ থেকে এবং শিকড় থেকে। শিকড় থেকে বংশবিস্তারের এই পদ্ধতিটা না থাকলে হয়তো বৈঁচি এতদিনে বিলুপ্তই হয়ে যেত।

Related posts

Leave a Comment